মেনু নির্বাচন করুন

জাটকা রক্ষা কর্মসূচী, খোকসা

জাটকা রক্ষা কর্মসূচী, খোকসা

দেশব্যাপী ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ০২ মার্চ ২০১৮ মেয়াদে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের এবারকার প্রতিপাদ্য হচ্ছে—জাটকা ধরে করবো না শেষ, বাঁচবে জেলে হাসবে দেশ। ইলিশ উত্পাদন বৃদ্ধিতে জাটকা রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়াই এ সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ উপলক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইলিশের ডিম পরস্ফুিটনের মাধ্যমে ইলিশের বাচ্চা ‘‘জাটকা” তৈরি হয়। ইলিশের পোনাকে (১০ ইঞ্চি/২৫ সেন্টিমিটার এর নিচে) জাটকা বলা হয়। আজকের জাটকাই আগামীদিনের ইলিশ। জাটকা নির্বিচারে ধরা হলে ইলিশের উত্পাদন কমে যায়। জাটকা নদ-নদীতে বিচরণ করে। তখন জেলেরা নির্বিচারে জাটকা আহরণ করতে চায়। নির্বিচারে জাটকা ধরা হলে ইলিশ উত্পাদন ও আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা জাটকা মাছ ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর।

ইলিশের জীবন চক্র বৈচিত্র্যময়। এরা সাগরের লোনাপানিতে বসবাস করে; প্রজনন মৌসুমে ডিম দেয়ার জন্য উজান বেয়ে মিঠা পানিতে চলে আসে। একটি ইলিশ তিন থেকে ২১ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। মিঠাপানিতে ডিম দেয়ার পর ২২-২৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা হয় এবং ৫-১৫ সেন্টিমিটার আকার পর্যন্ত ৫-৭ মাস এরা নদীতে থাকে। পরবর্তীকালে আবার সাগরের দিকে ধাবিত হয়। ইলিশ ১-২ বছর বয়সে (২২-২৫ সেন্টিমিটার আকারে পুরুষ ; ২৮-৩০ সেন্টিমিটার  আকারের স্ত্রী) প্রজননক্ষম হয়। তখন এরা আবার মিঠাপানির দিকে গমন করে। তখনই সাগর মোহনায় স্ত্রী ইলিশ মাছ অপেক্ষাকৃত বেশি ধরা পড়ে। ইলিশ মাছ সারাবছরই কম-বেশি ডিম দেয়; তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরই হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। অক্টোবর অর্থাত্ আশ্বিন মাসের প্রথম পূর্ণিমার ভরা চাঁদে ওরা  প্রধানত ডিম ছাড়ে। এজন্য আশ্বিনের বড় পূণির্মার পূর্বের চারদিন, পূণির্মার দিন এবং পরের ১৭ দিন (৪+১+১৭) ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এ লক্ষ্যে গত ১ অক্টোবর হতে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী  মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পালিত হয়েছে। 

বিগত ৮ বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ-যা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি সাফল্য। ইলিশ উত্পাদনকারী অন্যান্য দেশও বর্তমানে বাংলাদেশকে ইলিশ উত্পাদনের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে। গত ২০১৬ সালে ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইলিশের স্বত্ব এখন বাংলাদেশের।

ইলিশ উত্পাদন বৃদ্ধিতে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতে দেশে ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের জন্য চিহ্নিত এলাকাসমূহ হচ্ছে—বরিশাল জেলার সদর ও হিজলা উপজেলার কালাবদর নদীর ১৩.১৪ বর্গ কিলোমিটার, মেহেদিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার গজারিয়া ও মেঘনা নদীর যথাক্রমে ৩০ এবং ২৭৪.৮৬ বর্গ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রম এলাকার নদীসমূহের মোট দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৮২ কি.মি. এবং আয়তন ৩১৮ বর্গ কিলোমিটার। প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে এ এলাকাতেও মার্চ-এপ্রিল মাসে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে।

ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাটকাসমৃদ্ধ ১৭ জেলার ৮৫টি  উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩টি জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য মোট ৩৮ হাজার ১৮৮ মেট্রিক টন চাল প্রদান করা হয়েছে। জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময় ছাড়াও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন ২২ দিনের জন্য পরিবার প্রতি ২০ কেজি হারে মোট ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৩টি পরিবারকে মোট ৭,১৩৪ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাত্ ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত এ সরকারের বিগত ৯ বছরে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৫৭ মেট্রিক টন। বর্তমানে দেশে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া প্রকৃত মত্স্যজীবী ও জেলেদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে মত্স্য অধিদপ্তর থেকে ইতোমধ্যে ১৬ লাখ ২০ হাজার মত্স্যজীবী ও জেলেদের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৪ লাখ ২০ হাজার জেলের মাঝে পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে।

বিগত বছরে ইলিশ উত্পাদনের সফলতা জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পারছে, জাটকা ও মা ইলিশ  সঠিকভাবে সুরক্ষা করতে পারলে বর্ধিতহারে ইলিশ উত্পাদনের সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে। এজন্য জেলেরাও অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক দিক।


Share with :

Facebook Twitter